| কবি দাউদ হায়দার |
১৯৭৩
সালে লন্ডন সোসাইটি ফর পোয়েট্রি তাঁর একটি কবিতাকে ‘ দ্য বেস্ট পোয়েম অব এশিয়া
‘ সম্মানে ভূষিত করেছিল। তাঁর ‘সংগস অব ডেস্পায়ার’ বইতে তিনি একটি কবিতা লিখেছেন।
সেই থেকে তিনি নির্বাসিত। তাঁর আর ইছামতি নদী দেখা হয়নি। একটিমাত্র কবিতা লেখার
জন্য তাকে দেশছাড়া করা হয়েছে।
১৯৭৩
সালে “কালো সূর্যের কালো জোস্নায় কালো বন্যায়” লিখা কবিতার জন্য তাকে
জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকায় সকল মৌলবাদীদের সমাবেশ হয় একটি কবিতা ঘিরে।
একটা কবিতার এত শক্তি যা আমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জন্ম
যদি বাংলাদেশে হতো তবে তাকে মৌলবাদীরা হত্যা করতো। মিকেলেঞ্জেলোর জন্ম এই বাংলায়
হলে তাঁর পিয়েতা ভাস্কর্যের জন্য মৌলবাদীরা তাঁর হাতটাই ভেঙে ফেলতো। এজন্যই হয়তো
কবি দাউদ হায়দার লিখেছেন – “জন্মই আমার আজন্ম পাপ।”
১৯৭৪
সালের ২০ শে মে সন্ধ্যায় মুক্তি দিয়ে তার পরদিন প্রাণ বাঁচাতে কলকাতার এক বিশেষ
বিমানে কবি দাউদ হায়দারকে তুলে দেন বঙ্গবন্ধু। পুরো বিমানে একজনই যাত্রী ছিলেন
কবি দাউদ হায়দার।
১৯৭৬
সালে দেশে পাসপোর্ট নবায়ন করতে চাইলে সেই সুযোগটিও দেওয়া হলো না। ১৯৮৭ সালে
নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের বিশেষ চেষ্টায় কলকাতা থেকে জার্মানিতে
পাড়ি জমান তিনি। গত বছর বার্লিনের নয়াকোলনের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। জার্মান
পুলিশ জানায়, উনার মাথায় আঘাত ছিল।
সত্তরের
দশকের বাংলার প্রধান কবি, ব্রডকাস্টিং সাংবাদিক ও বিভিন্ন পত্রিকার জনপ্রিয় কলাম
লেখক চিরকুমার কবি দাউদ হায়দার এখন চির নিদ্রায় শায়িত। এই জাতির ঘুম ভাঙানোর
আগেই তিনি ঘুমিয়ে গেলেন।
এথেন্সের
রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় পৃথিবী শ্রেষ্ঠ দার্শনিক
সক্রেটিসকে হেমলক বিষপানে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি আজ অমর। বিজ্ঞানী জিওর্দানো
ব্রুনো বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্ব অসীম। ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে তাকে পুড়িয়ে হত্যা
করা হলো। শুধুমাত্র মুক্তবুদ্ধির চর্চার অপরাধে ইতিহাসের শেষ ‘প্যাগান
সায়েন্টিস্ট’ নারী গণিতজ্ঞ হাইপেশিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এরা সবাই আজ
ইতিহাসে অমর।
‘ডায়ালগ
অন টু মেইন ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ বইটি লেখার জন্য ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে বিজ্ঞানী
গ্যালিলিওকে কারাগারে পাঠানো হলো। গ্যালিলিও বলেছেন, “সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে
না, বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে।” এজন্য মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কারাগারে
পাঠানো হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে গৃহবন্দি অবস্থায় গ্যালিলিও লিখেন “ডিসকোর্সেস
অন টু নিউ সায়েন্সেস”। সত্য বলাটাই এই পৃথিবীর মৌলবাদীদের কাছে সবচেয়ে বড়
অপরাধ।
সত্য
উচ্চারণ করায় মির্জা গালিব, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে দেশ
ছাড়তে হয়েছে। “পাক সার জমিন সাদ বাদ” এই একটি বই লেখার জন্য বাংলাদেশের
অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবুও মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস
পর্যন্ত তাঁরা সত্য বলে গেছেন। সত্য বলার অপরাধে সর্বশেষ ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
স্যারকে পরিবার সহ দেশের বাইরে চলে যেতে হয়েছে এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবুও সত্য থামেনি, থামবে না। এজন্যই সত্য সব সময় সুন্দর।
সত্য
বলতে গিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ ট্রাভেলস ডকুমেন্ট নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ালেও
মৃত্যুর আগে একটিবার প্রিয় স্বদেশের মাটি স্পর্শ করতে পারেননি কবি দাউদ হায়দার।
তাইতো খুব আক্ষেপ করে তিনি বলে গেছেন,
“ভুলে
যাও ভিটেমাটিদেশ
তুমি
উদ্বাস্তু, আশ্রিত
তোমার
স্বদেশ বলে কিছু নেই
তুমি
পরগাছা, তুমি মৃত।”
ধর্মান্ধতার
এই অন্ধকার ভেঙে একদিন আলোকিত হবে পুরো বিশ্ব। কাঁচের দেয়ালের মতোই তছনছ হয়ে
যাবে পৃথিবীর সব মিথ্যার দেয়াল। তাইতো আমি বলি –
সত্য
সবসময় সুন্দর।
আলো
আসবেই
লুসিড ড্রিম(শুভ)
২৭-০৪-২০২৫







Leave a Reply